প্রেম বনাম দাম্পত্য—একটি বাস্তবচিত্র

প্রেম বনাম দাম্পত্য—একটি বাস্তবচিত্র



বিয়ের আগে প্রেম করা আর বিয়ের পরে সংসার করা—এই দুটি অভিজ্ঞতা একে অপরের চরম বিপরীত। প্রেমের সময়টা অনেকটা স্বপ্নের মতো। একটি রঙিন কল্পনার জগৎ, যেখানে দুজন মানুষ তাদের সেরা রূপটি নিয়ে উপস্থিত হয়। প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে মোহে আচ্ছন্ন করে রাখতে চায়, নিজেদের দুর্বল দিকগুলো খুব যত্ন করে আড়াল করে। সেই সময়ের কিছু ঘনঘন দেখা, সপ্তাহান্তের ডেট, হাতে ধরা হাতে হেঁটে বেড়ানো—সবকিছুতেই থাকে সাজানো আবেগ আর নিখুঁত উপস্থাপনা।

ছেলেটি চেষ্টা করে নিজের সামর্থ্যের সেরা চেহারাটি তুলে ধরতে, আর মেয়েটিও চায় প্রেমিক তাকে দেখুক নিখুঁত রূপে, যেন সে-ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। এই পর্বে বাস্তবতাকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা হয়। স্বাভাবিক রাগ, অভ্যাস, বা অতীতের তিক্ততা—এসব কিছুই যেন প্রেমের আবহে জায়গা পায় না।

কিন্তু বিয়ের পরে, সংসার জীবনে পদার্পণ করলেই সেই সাজানো ফ্যান্টাসির পর্দা খুলে যায়। এক ছাদের নিচে কাটানো দিনরাত্রির ভেতর দিয়ে মানুষটি ধীরে ধীরে সত্যিকারভাবে ধরা দেয়। তখন আর প্রেমের মোহনীয় রঙিন চশমাটা চোখে থাকে না। তখন দেখা যায় কারো ভোরের বিরক্তিকর ঘুমভাঙা মুখ, অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীর, বাচ্চার কান্না, বাজার-সদাইয়ের ব্যস্ততা আর রান্নাঘরের গন্ধমাখা জীবন।

প্রেমের সময় যে আকর্ষণ ছিল মুখোমুখি কিছু মুহূর্তে, সেটা সংসারের দীর্ঘ পথচলায় ক্ষয় পেতে শুরু করে যদি তাতে মজবুত ভিত্তি না থাকে। ভার্সিটির গেট থেকে বের হয়ে যে মুখ দেখার জন্য অপেক্ষা করত ছেলেটি, সেই মুখটাই একসময় হয়ে ওঠে অভিযোগের ক্যানভাস। প্রেয়সীর কোমল কণ্ঠস্বর যেটা একসময় হৃদয়ের দোলা তুলত, সেটাই এখন হয়তো দিনের শেষে ঘ্যানঘ্যান করে বাজে কানের কাছে। তখনই মনে পড়ে সেই পুরনো প্রশ্ন—“তোমাকে তো এমন কখনো মনে হয়নি!”

আসলে প্রেমে যে চটজলদি ভালো লাগা তৈরি হয়, সেটি সংসার নামক প্রতিষ্ঠানের জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়। সংসার গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর ত্যাগের ভিত্তিতে। এখানে শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন একে অপরের জন্য নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে শেখা।

সেক্যুলাররা প্রায়ই প্রেম করে বিয়েকে শ্রেষ্ঠ বলেন, আর অ্যারেনজড ম্যারেজকে তিরস্কার করেন। তারা বলেন, “ছোটবেলায় শেখানো হয় অপরিচিতের কাছ থেকে কিছু না নিতে, অথচ বিয়েতে সেই অপরিচিত মানুষের সাথেই ঘর করতে হয়!” কিন্তু তারা ভুলে যান, প্রেম করে বিয়ে করেও মানুষ সেই মানুষটিকে ভালোভাবে 'চিনে' ফেলতে পারে না। তিন বছর, পাঁচ বছর প্রেম করেও বিয়ের পর মানুষ বিস্ময়ে বলে উঠে—“সে তো এমন ছিল না!” সম্পর্কের শুরুতে শয়তান দুজনের মাঝের দুর্বলতাগুলো ঢেকে রাখে, যেন হারাম সম্পর্কের মোহ বাড়ে। কিন্তু বিয়ের পর সে পর্দা সরে গেলে মানুষটি হয়তো নতুনরূপে ধরা দেয়—নির্বিষ ছায়া হয়ে নয়, বরং রূঢ় বাস্তবতায়।

তবে সেই ছেলে, যে নিজের খুশির চাইতে আল্লাহর খুশিকে বড় করে দেখে, সেই ব্যক্তি যখন আল্লাহর দেখানো পথ অনুসরণ করে একজন দ্বীনদার নারীর হাতে নিজের জীবন তুলে দেয়, তখন সেখানে বরকত নামে। আল্লাহ এমন এক ‘ম্যাজিক’ দেন, যার ফলে সাধারণ চেহারার মেয়েটিও তার চোখে রাজকন্যার চেয়েও বেশি লাবণ্যময় হয়ে ওঠে। সন্তানেরা হয়ে ওঠে চোখের শীতলতা। তখন সেই সংসারে বিলাসিতা বা বাহুল্য না থাকলেও একটিই জিনিস থাকে—শান্তি।

আর শান্তি—এটাই তো আমাদের চূড়ান্ত চাওয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বেশিরভাগ মানুষ এই শান্তি খুঁজতে গিয়ে সেই মালিককেই অসন্তুষ্ট করে ফেলেন যিনি শান্তির একমাত্র দাতা—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা।


শেষ কথা
প্রেম সুন্দর, কিন্তু একে অপরের সত্যিকারের চেনার জন্য, সহনশীলতা, দায়িত্ব আর আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকলে প্রেমও হয়ে ওঠে ক্ষণস্থায়ী বুদবুদের মতো। সংসার হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে হয়, প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। আর আল্লাহর দিকে মুখ ফিরিয়ে সেই জীবন পার করলেই আসে শান্তির আলিঙ্গন, যা কোনো রোমান্টিক সন্ধ্যার থেকেও বেশি গভীর।

Post a Comment

Previous Post Next Post

Smartwatchs